কামিনীকাঞ্চন

অনদাশক্কর রায়

বাসি

এম. সি. সরকার আ্যাণ্ড সন্দ লিমিটেড ১৪ বস্কিম চাটুজ্যে ্বীট কলিকাঁতা-১

গ্রন্থের কপিরাইট শ্রীমতী লীল। রায়ের এর প্রচ্ছদপট শ্রীমতী লীল৷ রায়ের আকা

প্রথম সংস্করণ : ১৩৬১

তিন টাকা

প্রকাঁশক শ্রীস্থপ্রিয় সরকার, এম. সি. সরকার আগ সন্স লিমিটেড, ১৪ বঙ্কিম চাটুজ্যে স্ত্রীট, কলিকাতা ১২ মুদ্রক শ্রীগোপালচন্দ্র রায়, নাভানা প্রিন্টিং ওআর্কস লিমিটেড, ৪৭ গণেশচন্দ্র আভিনিউ, কলিকাতা! ১৩

হুমাস্ুম কবির বন্ধুবরেষু,

নিবেদন

এই গল্প-সংগ্রহের অধিকাংশ স্থলে আমি নিজেকে প্রক্ষেপ করেছি। তা বলে এগুলি আত্মজীবনীর অঙ্গ নয়। চরিত্রগুলি কাল্পনিক। গল্প লেখার একটা বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করতে গিয়ে রকম হয়েছে। এই পদ্ধতির এইখানেই ইতি

১.ই জৈযেষ্ঠ ১৩৬১ অনদাশঙ্কর রায়

কামিনীকাঞ্চন

সুচী

কামিনীকাঞ্চন পথ গেছে হারিয়ে ১৮ হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলে ৩৪ অভিমন্থ্যর ব্যুহ ৫১ ল্যাভেগ্ডার ৭৫ বান্ধবী ৯০ রানীপাসন্দ_ ১১৭

নারীচরিত্র পুরুষভাগ্য ১৩৮

কামিনীকাঞ্চন

ডাক্তার বললেন, “ভালো কথা, আপনার কাছে মভার্ন ফিলসফির নতুন বই থাকলে পড়তে দেবেন? আমাদের এই মফঃম্বল শহরে আর কে আছে! কার শরণাপন্ন হব!” তাকে খুব চিন্তিত বোধ হচ্ছিল।

আমি মনে করেছিলুম ডাক্তারের হঠাত দার্শনিক হবার শখ হয়েছে। পরিহান করে বললুম, “বিশ্বরহস্য ভেদ করতে চাঁন বুঝি ?”

“আরে নাঃ। আমি ওসবের ধার ধারিনে। খাই-দাই ফুতি করি। হবে এক দিন আপনার সঙ্গে তত্বালোচন]।”

“তবে বই নিয়ে কী করবেন ?”

“আমীর জন্তে নয়। আমাদের হাসপাতালে একটি ইণ্টারেন্টিং কেস এসেছে কেসটা ইণ্টারেন্টিং নয়। মানুষটি ইণ্টারেহিং বিখ্যাত বিদ্বান, অথচ আরণ্যক সন্ন্যাসী আপনি হয়তো তার নাম শুনেছেন ।”

আমি চমৎ্কত হয়েছিলুম। জানতে চাইলুম, কী নাম।

“ডকূটর বড়োদেকর। নাম তার গৃহস্থ আশ্রমের এখন তিনি স্বামী বিগ্যানন্দতীর্ঘ |”

"কোন বড়োদেকর? সেই ধিনি অক্সফোডে ছিলেন ?”

"তিনিই! তা হলে আপনি সব জানেন দেখছি ।”

নাম ছাড়া আর বিশেষ কিছু জানতুম না। কবে তিনি সন্ন্যাসী হলেন, কেন হলেন, জানতে ইচ্ছা ছিল। জিজ্ঞাসা করলুম, “কী হয়েছে তার? এখানে এলেন কী করে?”

কামিনীকাঞ্চন

“সায়াটিকা। চলুন না এক দিন দেখতে বলেন তো আজকেই নিয়ে যেতে পারি। আমি হাসপাতালেই যাচ্ছি ।”

আগ্রহ ছিল, কিন্তু সময় ছিল না, বললুম আরেক দিন যাব।

খান কয়েক বই বার করে তীর হাতে দিলুম। বইগুলো মডার্ন কিন্ত ফিলসফির নয়। তবু ভাক্তীর সেগুলো নিলেন। বললেন, “ধন্যবাদ, বড় বিপদে পড়েছিলুম | কিন্তু”

তিনি ইতস্তত করছিলেন। আমি একটু চাপ দিতেই বললেন, “একটা নেশা তো মিটল। আরেকট মিটবে কী করে তাই ভাবছি ।”

আমাকে কৌতুহলী দেখে মুচকি হাসলেন। “আপনার কাছে প্রকাশ করতে সাহস হয় না। হাসপাতালের স্থনাম নষ্ট হবে। কিন্ত কী করি, সাধুসন্ন্যানীর বেল! নিয়মকানুন খাঁটে না।”

আমার কানের কাছে মুখ এনে চুপি চুপি বললেন, “গীজা1।”

আমি হোহো! করে হেসে উঠলুম। বললুম, “তার পরে ?”

“রোজ রোজ জোগাড় করি কার কাছে!” তিনি আবার চিস্তাপ্থিত হলেন।

“কেন? শহরে কি আর কোনো সাধুসন্ন্যাসী নেই ?” আমি তামাশা করলুম।

“হা |” তিনি আর উচ্চবাচ্য না করে গাড়িতে উঠলেন।

আমি বিশ্মিত হয়ে ভাবতে বসলুম, কী কাণ্ড! যিনি অকৃস্ফোর্ডের বিশিষ্ট বিদ্বান তিনি আরণ্যক সাধু। যিনি মডার্ন ফিলসফির নতুন বই পড়েন তিনি গঞ্জিকাসেবী যাক, একে পাওয়! গেছে বাংলাদেশের এক প্রান্তে এক অখ্যাত ছোট শহরে দেখতে যেতে হবে। শুনতে হবে এর বিচিত্র কাহিনী

কামিনীকাঞ্চন

ডাক্তারকে চিঠি লিখে এক দিন হাসপাতালে হাজির হলুম। সাধুজী শয্যাশায়ী ছিলেন জেনারেল ওয়ার্ডের এক কোণে যে রোগী খরচা দিতে পারবে না তার জন্তে ওর চেয়ে ভালো ব্যবস্থা আর কী হতে পারে! বিনা খরচার রোগী হলেও সকলের দৃষ্টি তার উপরে তিনি কিছুমাত্র অন্থুবিধা বোধ করলে অমনি কেউ না কেউ ছুটে আসে।

আমার কুশল প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন, “খুব ভালো আছি। এর আমাকে রাজার হালে রেখেছেন ।”

ডাক্তার তা শুনে সবিনয়ে বললেন, “আমাদের সাধ্য থাকলে আমরা আপনাকে বাদশার হালে রাঁখতুম। আর করেকটা দিন একটু কষ্ট ভোগ করতে হবে।”

“কষ্ট ভোগ করব বলেই বাঁড়ি ছেড়ে বেরিয়েছি। আপনার] যদি কষ্ট ভোগ করতে না দেন তা হলে সব বুথা হবে।” এই বলে তিনি কৌতুকহাশ্ করলেন।

শুনলুম তিনি নিজের দোষেই রোগ বাধিয়ে বসেছেন। গিয়েছিলেন পদত্রজে জগন্নাথ দর্শন করতে হরিদ্বার থেকে জগন্নাথ। হরিদ্বারের উত্তরে এক গুহ! আছে, সেখানে তিনি তার গুরুভ্রাতারা থাকতেন টিহরির মহারাজার কৃপায় সেখানে এখন বিজলির আলো হয়েছে। প্রাচীন আধুনিকের এমন সমাবেশ অন্থাত্র বিরল। ইংরেজী স্কৃত হিন্দী বই কাগজের অভাব নেই। তপন্ঠার দ্রিক থেকে আদর্শ ্থান। তীর্ঘোপলক্ষে মাঝে মাঝে নিক্ষমণ করতে হয়। পারতপক্ষে পদব্রজে।

পায়ে হেটে কাশী পর্স্ত আসার অনুমতি পেয়েছিলেন খেয়াল হলো গয়। দেখবেন। পায়ে হাটলেন। সেখান থেকে ফিরে গেলেই

কামিনীকাঞ্চন

পারতেন কিন্তু সাধ জাগল র্থযাত্রার সময় জগন্নাথ দেখবেন আবার পায়ে হাটলেন। নিজের ক্ষমতার উপর অতিরিক্ত বিশ্বাম থেকে এই বিপত্তি। পুরীর হাসপাতালে বেশী দিন রাখল না।

আরে ছু'তিনটা হাসপাতাল ঘুরে অবশেষে এসেছেন এখানকার হাসপাতালে এরাও বেশী দিন রাখতে রাজি নন। রেলভাড়৷ সংগ্রহ করে বেহারের কোনোখানে গিয়ে সেখানকার হামপাতালে ভতি হবেন। পায়ে হাটার উপায় নেই। রেলপথেই হরিদ্বারে ফিরবেন। তার পরে তার গুহায় ঢুকবেন।

বললেন, “এমন কোনো অভিজ্ঞতা নেই যাঁর থেকে কিছু না কিছু লাভ করা ষায়। এই যে আমি চলতশক্তি হারিয়ে জড়ের মতো পড়ে আছি এও ভালো। আপনার মতো সজ্জন এসেছেন আমাকে দেখতে বই পাঠিয়ে দিয়েছেন, পড়ে আনন্দ পাচ্ছি। সোয়াইটসারের বই এই প্রথম পড়ছি। অনেক দিনের বানা পূর্ণ হলো ।”

সোয়াইটসার সম্বন্ধে ছু'চার কথার পর আমি বিদায় নিলুম। বললুম,

এখান থেকে চলে যাবার দিন আমার ওখানে আহারের নিমন্ত্রণ রইল।

খেতে খেতে আলাপ করা যাবে। আপনার আরোগ্য কামন। করি”

লৌয়াইটসারের বই আরো! ছু'একখানা ছিল। পাঠিয়ে দরিলুম।

মাস খানেক পরে তিনি আমার বাড়ী এলেন রিকশা! করে। তাকে ধরাধরি করে নামাতে হলো, নিয়ে যেতে হলো বসবার ঘরে। বসবার ঘরের মেজে এত পিছল যে একজন অতিথি একবার পা পিছলে পড়ে গেছলেন, কাজেই তাকে হুশিয়ার করে দিতে হলো।

কামিনীকাঞ্চন

জজের বাড়ির বিশেষত্ব ছিল চার দিকের খোলা বারান্দ_াী। যেমন ফাকা তেমনি চওড়া অথচ পিছল নয়। স্বামীজীকে বলায় তিনি তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে গেলেন। ছু'জনে গিয়ে বারান্দায় ছু'খানা ইজি চেয়ারে গা মেলে দিলুম তখন সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়েছে

বললুম, “আমি কিন্তু আপনাকে স্বামীজী বলে ভাকব না। ডাকব ডকৃটর বড়োদেকর বলে। এত বড় একজন ইনটেলেকচুয়ালের এই পরিণতি আমি মেনে নিতে পারছিনে ।”

তিনি মিষ্টি হাসলেন। বললেন, “ওসব পূর্বজন্মের মতো লাগে। মনে পড়লে মনে আনতে চাইনে |”

দার্শনিক আলোচনা করতে করতে যতবার আমি তার গৃহস্থ আশ্রমের প্রসঙ্গ তুলি ততবার তিনি বলেন, “সাধুদের ওসব বলা বারণ !”

তার জন্যে খৈ ছুধ ফলমূল মিষ্টান্ন তৈরি ছিল। ওখানেই টিপয় পেতে আহারের আয়োজন করে দেওয়া হলো। জিজ্ঞাসা করলুম, “আপনার কি প্ররুতি সম্ভাষণ করা নিষেধ ?”

“না তা কেন হবে? আমরা আধুনিক সন্গ্যাসী।”

তখন আমার স্ত্রী এলেন তার খাবার হাতে করে।

খেতে থেতে ব্ললেন, “গৃহস্থের বাড়ি কতবার অতিথি হয়েছি। সত্যিকারের ধর্মপরায়ণতা৷ দেখেছি সাধুদের চেয়ে গৃহস্থের মধ্যেই শুধু ধর্মপরায়ণতা নয়, আধ্যাত্মিক উন্নতিও |”

আমি একটু আশ্চর্য হয়ে বললুম, “তা কেমন করে সম্ভব! গৃহস্থরা যে কামিনীকাঞ্চনের পাশবদ্ধ। তাঁরা তো মুক্ত জীব নয়।”

“আমার অভিজ্ঞতা অন্যরূপ।” তিনি ধীরে ধীরে বললেন, “গুহায় যারা থাকে তাদের সম্বন্ধে বাইরের লোকের ধারণা যত উচু আসলে তারা

কামিনীকাঞ্চন

তত উচু নয়। তাদের মূল্যবৌধ বিকৃত। কামিনীকাঞ্চন ত্যাগ করেছে বলে যাদের গর্ব তারা কাঁমিনীকাঞ্চনকেই সব চেয়ে মূল্যবান মনে করে |”

আমরা শুনছিলুম। তিনি বলতে লাগলেন, “ছু'বেল! যারা ভোজনের কথা ভাবে, পেট না ভরলে বার্দের মন খারাপ হয়, তারাও বন্ধ জীব। তবে তারা একঠাই আবদ্ধ নয়। তারা যেখানে খুশি ঘুরে বেড়াতে পারে। তাদের সম্পত্তি নেই। সম্পত্তির টান তাদের টেনে রাখে ন1। তাদের পরিবার নেই। পরিবারের বীধন তাদের বেঁধে রাখে না। এই যা তফাৎ ।”

আমি বললুম, “এ কি সামান্য তফাৎ!”

“সামান্য নয়। তা! বলে এমন কিছু অসামান্যও নয়। মানবজীবনের যে ছু'টো৷ অভিশাপ গৃহস্থকে জালায় সে ছু'টো সাধুকেও জালাতন করে। হাওয়া খেয়ে কেউ বাচেনা। অন্তত এক বেলা আহার না করলে সাধনায় অগ্রসর হওয়া যায় না। অপর অভিশাপটার কথা নাই বা ব্ললুম |”

আমার স্ত্রী উঠে গেলেন। আমি বললুম, “তা হলে সাধু হয়ে এমন কী পরিবর্তন হলো! গৃহস্থ-আশ্রমে ফিরে গেলে এমন কী ক্ষতি!”

“ফিরে যাবার পথ নেই যেতেও চাইনে। তবে সাধু হয়েছি বলে মুক্ত জীব হয়েছি অহঙ্কার আমার নেই। কারুর থাকা উচিত নয়।”

আহারের পর লক্ষ্য করলুম তিনি আইঢাই করছেন। জিজ্ঞাসা করলুম, “পান ইচ্ছা করেন কি ?”

প্না।»

“সিগারেট ?”

“না, ধন্যবাদ ।”

কামিনীকাঞ্চন

কিছুক্ষণ পরে একটি ছাত্র এসে তীর সঙ্গে দেখ করতে চাইল। তিনি বললেন, “এবার আমার একটু নির্জনতা দরকার ছাত্রটিকে আসতে দিন।” আমি সরে গেলুম। ছাত্রটি এলো। কী একটা দিয়ে গেল তাঁকে

তিনি তাই নিয়ে বুঁদ হলেন। গন্ধ থেকে বুঝতে পারলুম কী ওটা।

গাজা সোসাইটির ভাইসচেয়ারম্যান ছিলুম। গন্ধ আমার চেনা। গাজা সোসাইটি শুনে আপনারা ভাবছেন গাজাখোরদের সংঘ। তা নয়। গাজাচাষীদের সমবায়।

গাজার ধেশায়ায় ঘর ভরে গেল। গৃহিণী অতিষ্ঠ হয়ে বললেন, “অকৃস্‌- ফোর্ডের ডক্টর তার এমন স্বভাব !”

আমি বললুম, “অক্ন্ফোর্ডের ডক্টর যখন ছিলেন তখন ছিলেন। এখন গুহাবাসী সাধু রোমে গেলে রোমানদের মতো ব্যবহার করতে হয়।”

তিনি অন্থমোৌদন করলেন না। তখন তাকে খুলে বলতে হলো ষে দ্বিতীয় অভিশাপের হাত থেকে উদ্ধার পাবার জন্যে সাধুরা সাধারণত এই তৃতীয় অভিশাপের আশ্রয় নিয়ে থাকেন এটা মার্জনীয়।

এর পরে এক সময় স্বামীজী আমাকে ডেকে পাঠালেন। গিয়ে দেখি তিনি উদাস হয়ে বসে আছেন। গীঁজা ফুরিয়ে গেছে। ছিলিম সরিয়ে রেখেছেন

আমি চুপ করে নিজের চেয়ারে আসন নিলুম।

তিনি আপনা থেকে বললেন, "ডকৃটর বড়োদেকরকে এই অবস্থায়

কামিনীকাঞ্চন

দেখে আপনার হয়তো চমক লাগছে তারও লাগত, ধদি তার জীবন অন্য রকম হতো এক কালে সাধু সন্নযাসীদের নিয়ে হাসিঠাট্রা করেছি। জানতুম না যে নিয়তি আমাকে এক দিন তাদেরই একজন করবে। নিয়তির রসিকতা যাকে বলে ।”

মৌতাত জমে উঠেছিল। মনে ছিল না যে সাধুদের এসব বলা বারণ।

“আপনি কখনো অকৃস্ফোর্ডে গেছেন ?”

“হা।”

“আমার কলেজের নাম ক্রাইস্টচার্চ। কী সুখেই কেটেছে সেই ক*বছর। যুদ্ধের পরে সেখানে যাই। বড় ঘরের ছেলে। টাকার ভাবনা! ছিল না। টাকা না থাকলে অকম্ফোর্ডে যাওয়৷ তূল। প্রথম কয়েক বছর পার্টি দিয়েছি, পার্টিতে গেছি, মেলামেশার চূড়ান্ত করেছি। কিন্তু বরাবরই আমি ছিলুম আত্মকেন্দ্রিক চিন্তা করতুম, চিন্তা করে যে আনন্দ পেতুম সে আনন্দের তুলনা নেই বাত জেগে বই পড়তুম। বই পড়ে যে আনন্দ পেতুম সেও অতুলনীয় কাজেই আমার ঝেক পড়ল ভালো ছেলেদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমে অদ্বিতীয় হতে। হলুম অদ্বিতীয় |”

আমি নীরবে শুনছিলুম। বাধা দিলুম না।

“আমার গুরুজনের ইচ্ছা ছিল আমি সিভিল সাভিসে যোগ দিই। কিন্ত অত শীগগির অকৃম্ফোর্ড ছাড়তে আমার ইচ্ছা ছিল না। সেইজন্তে ইচ্ছা করে সিভিল সাঁভিসের পরীক্ষায় খারাপ করলুম। গুরুজন অবাক হলেন, রাগ করলেন। হুকুম দিলেন ব্যারিস্টারি পড়তে তাতে দেখ! গেল আমি ফেল।”

কামিনীকাঞ্চন

“কিন্ত ফেল করতে তো! কোনে! দিন কাউকে দেখিনি

“হা, ফেল করা কষ্টকর তার জন্তে আমাকে বেশ মাথা খাটাতে হয়েছে রোমান আইনের প্রশ্নের উত্তরে লিখতে হয়েছে মেটাফিজিকৃদ |”

আমি হাসি চাপতে পারলুম না। তিনি তেমনি উদাসভাবে বলে চললেন, প্ডকুটরেট পেয়ে দেশে ফিরলুম, কিন্ত সরকারী চাকরির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলুম। তখন অসহযোগ আন্দোলন আরম্ত হয়ে গেছে। দেশের আবহাওয়া বদলে গেছে। গান্ধী মহারাজ জেলে। প্রাইভেট কলেজে কম বেতনের কাজ নিলুম। গুরুজন তা দেখে বিষম খাপপা। আমার পিছনে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে সেটা যে একটা ইনভেস্টমেন্ট এ-জ্জান আমার ছিল না। হলো, যখন গুরুজন সে কথা শুনিয়ে শুনিয়ে বললেন। মা'র উপর ভার পড়ল আমার জন্যে বড় ঘরের মেয়ে দেখার লোকমান যাঁতে পুষিয়ে যায় এক ভাবে না হোক অন্য ভাবে।”

একটু থেমে বললেন “আমার উচ্চাভিলাষ ছিল আমি হব ভারতের অদ্বিতীয় দার্শনিক আমার কাজে আমাকে সাহায্য করবে এমন কোনো সহধমিণী পেলে বিবাহ করতে আপত্তি ছিল ন1। লগুনে একটি মেয়ে পড়ত। আমাদেরই সমাজের মেয়ে। তার সঙ্গে বিয়ে হলে সে হতো আমার উপযুক্ত সঙ্গিনী কিন্ক তারা সন্ত্রস্ত নয়, তাদের টাকা নেই, তাদের সঙ্গে সম্বন্ধ করতে আমার গুরুজনের আপত্তি ছিল। মেকসেটি হ্বন্দরী নয়, তার বয়সও বৌ-মান্থষের পক্ষে একটু বেশী। এই কারণে মা তার উপর বিমুখ হলেন। আমি দার্শনিক হতে চাই শুনে হিতৈষীরা উতৎ্কণা প্রকাশ করলেন। তারা এমন মেয়ের সন্ধান

১০ কামিনীকাঞ্চন

করলেন যে আমাকে সংলারী করবে, লক্ষমীমন্ত করবে। আমি তখন বেঁকে বললুম | বলে দিলুম বিয়ে করব না।”

তার স্বর ক্রমে বিকৃত হয়ে আসছিল গাঁজা! খেলে যা হয়।

“এই ভাবে কয়েক বছর কাটল। মা! দেখলেন আমাকে সংসারী করার উপায় নেই। তখন অন্থখে পড়লেন। খুব সম্ভব অস্থখটা তার শ্বেচ্ছাকৃত। আমাকে তার করা হলো, তিনি মৃত্যুশধ্যায়, আমাকে দেখতে চান। বশে থেকে ছুটতে হলে! বড়োদায়। গিয়ে দেখি সকলে চোখ মুছছে। ডাক্তার নাকি জবাব দিয়ে গেছে। মা?র ঘরে যেতেই মা ইশারায় কাছে ডাকলেন। কাছে ছিল একটি অচেনা মেয়ে তার একখানি হাতের সঙ্গে আমার একখানি হাত একত্র করলেন তারপর কেবল কাদতে থাকলেন আমার বোন মে ঘরে ঢুকে আমার কানে কানে বলল, মাঁঁকে যদি বাচাতে চাও তা হলে বলো, আমি রাজি। আমি বুঝতে পারলুম না কিসে রাজি। যন্ত্রালিতের মতো ব্ললুম, আমি রাজি। ওদিকে শাখ বেজে উঠল। তখন আমার খেয়াল হলো যে আমি বিয়েতে রাজি। একবার রাজি হয়ে তারপর আর পিছিয়ে যাওয়া চলে না। মা সে যাত্রা বেচে গেলেন আমি বিয়ে করলুম ।”

আমি মন দিয়ে শুনছিলুম বললুম “তার পরে ?”

“তার পরে? তারপরে ঘা হয়ে থাকে প্রথম কয়েক মাস কাটল উৎসবে, আনন্দে মেয়েটি সুন্দরী, স্থশীলা। আমাকে স্থুখী করতে তার প্রাণপণ চেষ্টা। কিন্তু শিক্ষিতা নন। তার সঙ্গে কথা বলে একজন ইনটেলেকচুয়াল কী করে তৃপ্তি পাবে! আমি যে কে, আমার কী যে কাজ, তাকে বোঝানো বৃথা আমর! দু'জনে ছুই জগতের লোক।

কামিনীকাঞ্চন ১১

একসঙ্গে বান করি, কিন্তু কেউ কাউকে চিনিনে। যা হোক, দিনগুলো মন্দ কাটছিল না। মোটের উপর আমরা স্থখী দম্পতিই ছিলুম। তবে আমি যা উপার্জন করতৃম তাতে আমাদের কুলোৌত না স্ত্রীর সম্পত্তিতে হাত দিতে আমার দ্বণা বৌধ হতো]। সেইজন্যে এক মহারাঁজার কাছ থেকে যখন প্রস্তাব এলো তার কুমারদের গৃহশিক্ষক হবার, আমি সম্মতি দিলুম। বন্বে ছাড়তে হলো না। বন্বেতে মহারাজার প্রাসাদ ছিল। সেইখানে থেকে তারা পড়াশুনা করতেন। পড়াশুন! অবশ্য নামমাত্র খেলাধূলা আমোদপ্রমোদ সহব সামাজিকতা নিয়ে তারা মশগুল। আমি আমার নিজের কাজের জন্তে যথেষ্ট সময় পেতৃম। কিন্তু রাজ-পরিবারের সংস্পর্শে এসে আমার স্ত্রী হয়ে উঠলেন সোসাইটি উওম্যান। অবসর সময়ে দর্শনচর্। করব কি, খোকাখুকুকে সামলাতে হতো চাকরদের হাতে ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারতুম না। তারপর খরচ দিন দিন বাড়তে লাগল। অন্থযোগ করলে তিনি বলতেন, আম।র টাকায় আমি বিবিয়ানা করি তোমার টাকায় করিনে এর উত্তরে আমি বলতুম, তাই যদি করবে তবে আমাকে বিয়ে করার দরকার কী ছিল? তখন তিনি প্রত্যুত্তর দিতেন, মেয়ের! বিয়ে করে কেন? এর কোনো জবাব মনে আসত না। আপনি বলতে পারেন, মেয়েরা বিয়ে করে কেন?”

আমি থতমত খেয়ে বললুম, “এমনি |”

“উন অমন করে এড়িয়ে গেলে চলবে না। যতই চিস্তা করবেন ততই গলদ্ঘর্ম হবেন। বহু মনীষী এনিয়ে মাথা ঘামিয়েছেন। কেউ কোনো স্থির সিদ্ধান্তে পৌছতে পারেন নি। নাচার হয়ে মেয়েদের গাল পেড়েছেন। তাদের অপরাধ তার! কামিনী যেন পুরুষরা

১২ কামিনীকাঞ্চন

কামী নয়। কাঞ্চনকে জুড়ে দিয়েছেন কামিনীর সঙ্গে .যেন একের সঙ্গে অপরের হরিহর সম্পর্ক। স্ত্রী যদিও আমার টাকা খরচ করতেন না তবু আমার আত্মসম্মানে বাধত। আমি আপত্তি করলে তিনি বলতেন, তুমি যখন অকৃস্ফোর্ডে ছিলে তখন বাপের টাকা ছু'হাতে খরচ করতে মনে করো আমার বাবা আমাকে অক্সফোর্ড না দিয়ে বিয়ে দিয়েছেন এমন কী অন্যায় করছি আমি, যা তুমি করোনি! কথাট। উড়িয়ে দেবার মতে! নয় আমিও তো এক কালে সামাজিকতার চূড়ান্ত করেছি আমার বয়সে আমি যা করেছি তার বয়সে তিনি তাই করছেন অথচ আমার একটুও ভালো লাগছে না। মনে হচ্ছে এর একটা জবাব আছে, যদিও মাথায় আসছে না কী জবাব। প্রাচীনেরা হলে এক কথায় শেষ করে দিতেন | স্ত্রী স্বাতস্ব্যমর্থতি। আমরা আধুনিকেরা তা তো পারিনে। থীসিস ফাদি। আমার দার্শনিক চিন্তা পথভ্রষ্ট হচ্ছিল বলে আমার মনে ক্ষোভ জমছিল।”

০০

তার কণম্বর বিকৃত হতে হতে ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে আসছিল। আমি বললুম, “একটু জল খাবেন ?”

তিনি বললেন, “জল নয়, ছুধ কিংবা কোকো 1”

কোকোর জন্যে বলে পাঠালুম

“কুমারদের অক্স্ফোর্ডে দেবার কথাবার্তা চলছিল। মহারাজার ইচ্ছা আমিও তাদের সঙ্গে যাই। অভিভাবক হই। আমারও ইচ্ছা করছিল আরেক বার অকৃস্ফোর্ডে গিয়ে দার্শনিকদের সঙ্গে যোগ স্থাপন করতে | কে কী ভাবছেন কে কী লিখছেন সে সম্বন্ধে খোজ খবর নিতে

কামিনীকাঞ্চন ১৩

স্খোন থেকে কর্টিনেপ্ট ঘুরে আসার অভিলাষ ছিল। কিন্তু স্্রীপুত্র- কন্তাকে পিছনে ফেলে যেতে কষ্ট হচ্ছিল। সঙ্গে নিয়ে যাওয়া তো অর্থসামর্থযে কুলোয় না। তা হলে স্ত্রীর টাকা নিতে হয়। তাতে আমার আন্তরিক আপত্তি।”

কোকো এলো তিনি আস্তে আন্তে বলতে লাগলেন, “এই নিয়ে স্্ীর সঙ্গে ঝগড়া হয়ে গেল। আমি তাঁকে তার বাপের বাড়ী পাঠিয়ে দিলুম। বললুম, আমার কাজ আছে বলে আমি বিদেশে যাচ্ছি আমি ফুতি করতে যাচ্ছিনে। তোমার কাজ থাকলে তুমিও যেতে কিন্ত তুমি তো বাড়ীর কাজ করবে না, ছেলেমেয়েকে দেখবে না আমারই ঘাড়ে চাপাবে। মাটি হবে আমার কাজ। তা হলে বিদেশে যাওয়। বুখা। তিনি এর একটা কড়া উত্তর দিয়েছিলেন বলেছিলেন, তুমি যে ওখানে ব্রন্ষচারীর মতো থাকবে আমি বিশ্বাস করিনে। কেন তা হলে আমাকে দগ্ধে মারবে! আমি তাকে যতই বলি, যতই বোঝাই, তিনি ততই উন্মত্ত হন। কিন্তু কী করি, আমার উপায় ছিল না সপরি- বারে বিদেশযাত্রার। গিয়ে দেখলুম যা ভেবেছিলুম তাই দার্শনিক চিন্তা আমার অবত্তমানে অনেক দূর এগিয়ে গেছে আমি সেই পরিমাণে পিছিয়ে পড়েছি। দারুণ খাটতে হবে। খাটতে লাগলুমও মাঁসের পর মাস কেটে গেল অগ্রসরদের পশ্চাদ্ধাবন করতে মেয়েরা এর কী বুঝবে! কেবল চিঠি লিখবে, চলে এসো, খোকীর জর। চলে এসো, খুকুর আমাশয় চলে এসো, আমার মাথা খারাপ। হোল্ট্বি আমার সতীর্ঘ। এই ক'বৎসরে সে যা নাম করেছে তা আশ্চর্য হবার মতো সে যেন হলডেন আর আমি যেন পিকেবায়। আমাকে অন্থকম্পার চক্ষে দেখে। কুস্তিতে হেরে গেছি আমি, জিতেছে সে, তাই আমার

১৪ কামিনীকাঞ্চন

প্রতি অন্ুকম্পা। পুরুষের ছুঃখ মেয়েরা বুঝবে কী! আমি একটা পেপার লিখেছিলুম। হোল্ট্বি তার উপর চোখ বুলিয়ে বল্ল, তুমি একটি রিপ ভ্যান উইঞ্কচল। এসব খিয়োরি কবে উদ্টে গেছে ।”

বড়োদেকর দীর্ঘশ্বাম ফেলে বললেন, “জীবনটা ব্যর্থ গেল। কোনো কাজেই লাগল না। হোল্টবি গরিবের ছেলে। বিয়ে করেনি। অকৃস্ফোর্ডের মাটি কামড়ে পড়ে আছে শুধু জ্ঞানার্জনের জন্য, জ্ঞান- ভাগ্ডারে নিজের বলতে কিছু দান করবার জন্য আর আমি! বাপের কথায় বাড়ি ফিরি, মায়ের কথায় বিয়ে করি, স্ত্রীর মুখ চেয়ে মহারাজার গৃহশিক্ষক হই। হোল্টবি এক দ্রিন আলেকজাগ্ডারের কিংবা বারট্রাণ্ু রাসেলের সমকক্ষ হবে। আর আমি হব পাঠ্যপুস্তক রচয়িতা কথা ভাবতেই জীবন বিশ্বাদ হয়ে ওঠে। দেশ থেকে যখন তার আসে খোকার টাইফয়েড, দেখতে চাও তো! আকাশপথে উড়ে এসো, পাথেয় পাঠাচ্ছি, তখন অবিশ্বাম করি। মায়ের অস্থখের মতো এটাও একটা অভিনয় আমাকে এরা কেউ বিখ্যাত দার্শনিক হতে দেবে না। দেশে ফিরিয়ে নিয়ে বলবে, বিশ্ববিগ্ভালয়ের চেয়ার খালি হচ্ছে। তদ্বির করো। আমি ফাদে পাদেব না। যতদিন পারি অকৃস্ফোর্ডে পড়ে থাকব। ট্রীঙ্ক কল করে খবর নিলুম। মনটা উতলা হলো। জোর করে মনকে বুঝ দিলুম, কার্ল মার্কসেরও ছেলে মারা গেছল, তিনি তা বলে পথভ্রষ্ট হননি। দেশে ফিরে গেলেই যে সে বাচবে তার নিশ্চয়তা কোথায় ! একবার ফিরে গেলে কি ফের আসতে পাব! না, যাৰ না।”

সন্ন্যাসীর চোখে জল দেখা দিয়েছিল। গাঢ় কণ্ঠে বললেন, “মারা গেল। যাবার আগে তার বিশ্বাম ছিল তার বাবা মেঘের উপর দিয়ে উড়ে আসবে সে আকাশের তলায় শুয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকাত

কামিনীকাঞ্চন ১৫

আর ক্ষণে ক্ষণে বলত, কই, বাবা কোথায়! বাবা বাবা করেই মারা গেল ছেলেটি খবরট1 যখন পেলুম তখন সে যেকী ছুংখ তাআমি কোনোদিন কাউকে বোঝাতে পারব না। দুঃখের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল অপরাধবোধ মনে হচ্ছিল মরা উচিত ছিল আমারই, তার নয়। বেচে থেকে আমি কার কী উপকার করব! মে যদি বেঁচে থাকত জগংকে দিয়ে যেত কত কী সম্পদ! দর্শনশাস্ত্রে আমি শাস্তি বা সান্ত্বনা খুজে পেলুম না। মৃত্যুরহশ্য ভেদ করার ক্ষমতা কোনে দার্শনিকের নেই। চিন্তা এখানে অক্ষম। বুদ্ধি এখানে পরাস্ত দর্শনের উপর আমার বিতৃষ্ণা ধরে গেল। যশের জন্যে দর্শনচর্ঠা আমার কাছে ছেলেখেলা! মনে হলো। সঙ্কটের আলোয় নিজেকে চিনলুম আমি হোল্টুবির মতোর্্ঞানের জন্ত জ্ঞানের উপাসক নই আমি উচ্চাভিলাষী কিন্তু কী মূল্যে?”

তিনি এবার জল চাইলেন। পানীয় জল। তার গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল।

ব্ললেন, “মহারাঁজার চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে দেশে ফিরে এলুম ফিরে এসে দেখলুম শ্বীকে নিয়ে গেছে পাগল গারদে। মেয়েকে কোলে নিতে চাই, শাশুড়ী নিতে দিলেন না। বললেন, তোমার সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক নেই। তুমিও যা, একজন বান্তার লোকও তাই মেয়ে পরের কোলে যাবে নাঁ। মেয়েটাকে ওর] কী যে শিখিয়েছিল, সেও একবার বাঝ! বলে ডাকল না। মুখ ফিরিয়ে নিল। অথচ এই মেয়েই ছিল আমার নয়নের মণি! একে কোলে নিয়ে আমি দিনের পর দিন পায়চারি করে কাটিয়েছি রাত্রে মেয়ে কাদত। তখন এর খাটের কাছে গিয়ে আমি এর মাথায় গায়ে হাত বুলিয়ে দিতুম। এর মা

১৬ কামিনীকাঞ্চন

বিছানা থেকে 'উঠতেন না। তার ঘুম সহজে ভাঙত না। ভাঙালে তিনি আমাকেই তার কাছে পাঠাতেন। সেই মেয়ে আমাকে চিনতে পারুল কিনা সন্দেহ মেয়ের অকৃতজ্ঞতায় বিমর্ষ হয়ে আমি রাজা লীয়ারের মতো গৃহত্যাগ করলুম নানা স্থানে বেড়ালুম। কত সাধকের সঙ্গে আলাপ হলো তার পরে একদিন পেয়ে গেলুম আমার গুরুকে তিনি আমাকে সংসারে থাকতেই উপদেশ দিয়েছিলেন স্ত্রীর সেবা করতে, মেয়ের ভার নিতে আমি তার কথামতো চেষ্টা করে ছিলুম কিছু কাল। বৃথা চেষ্টা। যে পাগল নয় তার পাগলমি সারানো যায় না। সে সব কথা এত ইন্টিমেন্ট যে বলবার মতো! নয়। এমন কি, গুরুর কাছেও নয়। তিনি অন্ুমানে বুঝলেন তার পরে দীক্ষা দিলেন তার পর থেকে এগারো বছর অতীত হয়েছে সন্সয।সীকে পরিত্যক্ত পরিবারের সংবাদ নিতে নেই। আমিও নিইনি। তারাও দেয়নি বেচে আছে কি না জানিনে। থাকলে কোথায় আছে, পাগল! গারদে না বাপের বাড়ীতে, তাও জানিনে। আমার মা-বাবা আগেই মার! গেছলেন। কাজেই শ্বশুরবাড়ীতে থাকা সম্ভবপর নয়। মেয়ের বিয়ের বয়স হয়েছে এই আশ্বিনে আঠারোয় পড়বে আমাদের সমাজে বিয়ের বয়স ক্রমে বাড়ছে আশা করি সে যতিন পারে অনৃঢা থাকবে। ভাবতে কষ্ট হয়যে সে আমার মতো একটা অপাত্রের হাতে পড়বে। না, তার চেয়ে চিরকুমারী হওয়া ভালো 1”

এর পরে তিনি ভে] হয়ে আবোল তাবোল বকতে আরম্ভ করলেন। তাকে ঘাটাতে সাহসী হলুম না রাত হয়েছিল। তার ট্রেন বারোটায়। তার আগে দি ঘুমিয়ে নিতে পারেন তো! মন্দ হয় না।

এমন সময় ডাক্তীরের গলা শোনা! গেল বাইরে। তিনি এসেছিলেন

কামিনীকাঞ্চন ১৭

মোটর নিয়ে সাধুজীকে স্টেশনে পৌছে দিতে স্টেশনের ওয়েটিং রুমে তার বিছানা পাতা হবে। তিনি সেখানে বিশ্রাম করবেন। ধানবাদের টিকিট কাটা হয়েছে সীট পাওয়া গেছে ওখানকার হাসপাতালে

আবার তাকে ধরাধরি করে গাড়িতে তুলে দিতে হলো। গাড়িতে উঠেই বললেন, “আমার কন্‌্কে ? আমার কল্কে কে নিল?” কল্কের জন্যে ছুটতে হলো! বারান্দায়। কল্‌কে পেয়ে তিনি স্বর্গ হাতে পেলেন। যত্ব করে আলখাল্লার পকেটে পুরলেন। তার পর আমার দিকে চেয়ে বিখ্যাত বিদ্বান বড়োদেকর বললেন, “ব্যোম ব্যোম। বাবু সাহেব, ব্যোম ব্যোম।”

গাড়ি ছেড়ে দিল।

১৯৫০ )

পথ গেছে হারিয়ে

চত্্রকিরণের সঙ্গে আমার আলাপ ছিল না। আলাপ হলো হঠাৎ এক দিন এক সাহিত্যের আসরে বলল, “আমি তো সাহিত্যিক নই। কী বলে নিজের পরিচয় দেব ?”

আমি তাকে অভয় দিয়ে বললুম, “আমিও লাহিত্যিক নাকি? জীবনের ডাক শুনলে যে কোনো দিন সাহিত্যের পাট তুলে দিতে পারি ।”

“তা হলে,” চন্দ্রকিরণ আশ্বস্ত হয়ে বলল, “আপনার সঙ্গে আমার বনবে ভালো। সত্যি বলতে কি আপনাকেই আমি খু'ঁজছিলুম 1”

আসর থেকে লুকিয়ে এক সময় বেরিয়ে পড়লুম আমরা ছু'জনে। ছেলেবেলায় যেমন ক্লাস থেকে পালিয়েছি | রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে, ফুটপাথে দাড়িয়ে চা খেয়ে, চানাচুর চিবোতে চিবোতে আমর! পরস্পরের যে পরিচয় দিলুম নিলুম তা নিত্যকালের কিশোরব্য়সীর। অথচ তখন আমাদের বয়স ত্রিশের কোটায় কলকাতায় কেউ কাউকে চেনে না বলেই রক্ষাঁ। মফংম্বল হলে টি টি পড়ে যেত।

«“এইজন্যেই,” আমি বললুম, “কলকাতা আমার এত ভালো লাগে এখানে আমি নামহীন পরিচয়হীন অজ্ঞাত অখ্যাত মুসাফির। আমি 81)017%120005 1”

“সেইখানেই,” চন্দ্রকিরণ বললেন, “আমার ছুঃখ। কলকাতা শহরে আমি আর ৪1507510005 নই। এবার বেরিয়ে পড়তে চাই আত্ম- পরিচয় গোপন করে ছন্মনামে ছন্নবেশে কলকাতার বাইরে, ভারতের বাইরে।”

পথ গেছে হারিয়ে ১৯

“কোনখানে ?”

“আপাতত ইউরোপে ।”

“কেন, আগে কখনো! যাননি ?”

“কত বার গেছি পক্ষিরাজের পিঠে সওয়ার হয়ে।” তার পর 'করুণ হেসে বলল, “মায়ের একমাত্র পুত্র স্ত্রীর অঞ্চলের নিধি |”

আমি ছুঃখিত হয়ে বললুম, “তা হলে আপনার মনে একটা আফসোস রয়ে গেছে, বলুন |?

“শুধু কি আফসোল? আকুলতাও। “ওগো স্থদুর, বিপুল সদর, তুমি যে বাজাও ব্যাকুল বাশরি। মোর ডানা নাই, আমি আছি এক ঠাই, সে কথা যে যাই পাসরি | আর ভালো লাগে না এমন করে বেঁচে থাকতে বেঁচে থাকা-_নয় সে তো বাচা আমি বাচতে চাই ।”

আমাদের কথাবার্তা ক্রমেই গভীর থেকে গভীরতর পর্যায় ধরে চলল। আমরা তুলে গেলুম যে আমাদের আলাপ মাত্র একদিনের

চন্দ্রকিরণর! কলকাতার বনেদী ভদ্রলোক পুরুষাহ্ুক্রমে সলিসিটর। বিত্বের অভাব কাকে বলে জানে না। বিভ্তের সঙ্গে যোগ দিয়েছে বিছ্যা। বিগ্যার সঙ্গে রূপ চন্দ্রকিরণ যেমন বিদ্বান তার স্ত্রী তেমনি রূপবতী বিয়ে হয়েছে অনেক্দিন। কিন্তু সন্তান হয়নি। স্ত্রী এরই মধ্যে ধর্.-কর্মে মন দিয়েছেন। চন্দ্রকিরণ কোনো দিকে মন দিতে পারছে না। মন লাগছে না। কোথাও চলে যেতে চায় কিছুদিনের জন্যে তারও উপায় নেই কড়া পাহারা, চোখের জল, প্রায়োপবেশন

দুঃখের উপর দুঃখ, কারো সঙ্গে প্রাণ খুলে মিশতে পারে না। সর্বদা একটা ব্যবধান বজায় রাখতে হয়। নইলে বংশের মানহানি প্রোফেসনের মধাদাহানি সন্ত্রাস্ত ভদ্রলোক হয়ে জন্মেছে বলে তাকে

২০ কামিনীকাঞ্চন

সারাজীবন সন্ত্রস্ত ভদ্রলোকের ভূমিকায় অভিনয় করে যেতে হবে। পাইস হোটেলে আসনপি'ড়ি হয়ে বসে পচা মাছের ঝোল মাছিদের সঙ্গে ভাগ করে খেতে পাবে না। মেসের কেরানীদের সঙ্গে চৌবাচ্চার জলে আছুল গায়ে সান করতে পাবে না। বস্তির লোকের সঙ্গে রাত জেগে পাড়ার লোককে জাগিয়ে পাখোয়াজ বাজিয়ে গান জুড়তে পাবে না। সিগারেট খেতে আপত্তি নেই, কিন্ত বিড়ি খেলে জাত যাবে মদ খেতে পারো, কিন্তু খবরদার তাড়ি কিংবা ধেনো খেয়ো না। জুতো সেলাই থেকে চত্তীপাঠ পবস্ত কত কী করতে সাধ যায়, কিন্ত জুতো বুকষ করতে বসলে বেয়ারা ছুটে আসে-হা, হা, কী করছেন! একি আপনার কাজ! ঝাটা হাতে করলে জমাদীর তেড়ে আসে- হা, হা, কী করছেন! ছোটলোকের কাজ। ইচ্ছ! করে রিকৃশা টানতে রিকৃশাওয়ালাকে বকশিষ দিয়ে টেনেও ছিল একদ্রিন। অমনি পাড়াশুদ্ধ লোক ভেঙে পড়ল দৃশ্য দেখতে কোচমানকে বলে কয়ে ফিটন চালাতে গিয়ে দেখে কে একটা ভিখিরী চাঁপা পড়ে আছে অমন করে সবাই মিলে যদ্দি বাধা দেয় তা হলে চন্দ্রকিরণের কোনো কাজই করা হয় না, এক অর্থোপার্জন ছাড়া

আর অধোপাজজনে কি স্থখ আছে! পরস্ব অপহরণের যত রকম পদ্ধতি আছে তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো বণিকবৃত্তি। বণিকের ধন সলিসিটরের ঘরে আসে, যেমন চোরের ধন বাটপাড়ের খপপরে। চন্দ্রকিরণের ভালো লাগে না চুরি কিংবা বাটপাড়ি। ঘেব্না! ধরে যায় নিজের উপর, পরের উপরে কিন্তু কাকে বলবে কথা! বাপ কাকা মামা মেসো সকলেরই পেশা, বৃত্তি। গুঁরা হয় বণিক নয় সলিসিটর বাইরের লোকের সঙ্গে মেশা বারণ। যদি বা মেশে তবু প্রাণ খুলে কথা

পথ গেছে হারিয়ে ২১

বলতে পারে না। ব্যবধান বজায় রাখতে প্রাণাস্ত। ক্লাবে যায়, সেখানে যাদের সঙ্গে টেনিস খেলে বা ককৃটেল খায় তারাও তার নিজের শ্রেণীর লৌক। তারা এক মিনিটও ভাবে না, কেমন করে টাকাটা আসছে, অমন করে আসাটা কি ভালো, সমাজের কি ওতে মঙ্গল হচ্ছে, না অমঙ্গলের বারুদ জমছে !

চন্দ্রকিরণ দীর্ঘনিঃশ্বাল ফেলে বলল, “হীয়! একবার যদি বেরিয়ে পড়তে পারতুম 1?

“ত৷ হলে?” আমি কৌতুহল প্রকাশ করলুম।

“তা হলে? তা হলে মরা গাঙে বান ডাকত সমুদ্রের হাওয়া আমাকে ছু*দিনেই চাঙ্গা করে তুলত। আহ্‌! কী যে ভালো লাগত জাহাজে চড়ে দুলতে 1”

আমি হেসে ব্লুম, “তারপরে যখন সী সিকৃনেস হতো! তখন কিন্তু ভালো! লাগত না।”

“লাগত, লাগত সব কিছু ভালো লাগত। সী সিক্নেস। পাঁচ সাত দিন বিছানায় শুয়ে থাকা। তারপরে যেন নতুন জীবন ফিরে পাওয়া। নতুন চোখে দেখা। নতুন পায়ে হাটা। চলি চলি পা পা।”

আমি শুনতে লাগলুম বলতে লাগল চন্দ্রকিরণ, “ইংলগ্ডে পৌছে আমি ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যেতুম। কেউ আমার খোজ পেত না, বাড়ীতে জানাত না। মজুরদের সঙ্গে রাস্তা মেরামত করতুম আর তেষ্টা পেলে 2এ৮-এ ঢুকে সন্তা বীয়ার খেতুম। আর খিদে পেলে খেতুম কুচো মাছ আর আলু ভাজা থাঁকতুম কোনো বস্তিতে ।”

এই আরব্য উপন্যাসের গল্প শুনতে মন্দ লাগছিল না। শুনছিলুম

২২ কামিনীকাঞ্চন

আর মিলিয়ে দেখছিলুম চন্দ্রকিরণের প্রকৃতির সঙ্গে এর কোনো সঙ্গতি আছে কি না।

“তবে মাসের মধ্যে ছু'তিন দিন সাজ বদল করে [102এ গিয়ে উঠতুম। নইলে আবার সেই খাড়া বড়ি থোড় খেতে খেতে অরুচি ধঝে যেত। আবার সেই একঘেয়ে জীবন, যাঁর জন্যে দেশ ছেড়ে পালানো”

“তা বলে এক লম্ফে 910) থেকে 7121 মাঝখানের ধাপগুলো! কী দোষ করল!” আমি জানতে আগ্রহ বোধ করছিলুম।

“না, না। আর ও-সব ভালো লাগত না। দেশে থাকতে ও-সব যথেষ্ট হয়েছে সত্যিকারের নতুন কিছু চাই বলেই তো! বিদেশে বিভূয়ে ঘুরে বেড়ানো |”

এর পরে চন্দ্রকিরণ পাঁড়ল প্যারিসের কথা সেখানে সে শিল্পীদের সঙ্গে জুটে বোহেমিয়ান হবে। কাফে আর বুলভার্দ, স্ট,ডিও আর সালেো। সাজপোশাক বহুরূপীর মতো যে দেখবে সে বলবে, হা, আর্টিস্ট বটে সার্কাসের বাইরে এমনটি আর দেখা যায় না। ছাত ফু'ড়ে জল পড়ছে, ছাতা মাথায় দিয়ে ছবি আক। হচ্ছে এই তো জীবন!

কিন্তু কিছুদ্দিন বাদে এখানেও সেই থোড় বড়ি খাড়া মেইজন্যে মুখ বদলানোর জন্তে যেতে হয় দক্ষিণ ফ্রান্সে। মন্তে কার্লো, নীস, মোনাকো কাসিনোতে জুয়োখেলার ধুম হারজিৎ যা থাকে কপালে একেই বলে জীবন।

দেদ্দিন কথা বলতে বলতে কখন এক সময় সে আমাকে আমি তাকে “তুমি” বলতে শুরু করেছিলুম বললুম, “চন্দ্রকিরণ, এক বার বেরিয়ে না পড়লে তোমার দরিবাস্বপ্র ভাঙবে না। বেরিয়ে পড়লে দেখবে স্বপ্রে বাস্তবে অনেক তফাৎ্। তুমি বেরিয়ে পড়ো।”

পথ গেছে হারিয়ে ২৩

“বেবিয়ে পড়তে দিচ্ছে কে ! বুদ্ধদেবের যশোধরা ঘুমিয়ে পড়েছিলেন বলে তিনি বেঝিয়ে পড়তে পেরেছিলেন আমার যশোধরা রাত ভর এক চোখে ঘুমোয়। তার মানে পাহারা দেয় 1” চন্দ্রকিরণ ক্ষোভের সঙ্গে বলল।

“যশোধরাকেও নিয়ে যাও না কেন? আজকাল কত লোক সম্ত্রীক বিলেত যায়। তোমার তো অর্থের অভাব নেই 1”

“ওকে নিয়ে যাবার কথা বলছ! তা হলে সব মাটি হবে। আমি কোনো মতে আত্মগোপন করতে পারি। কিন্তু ওকে গোপন করব কোথায়! আমার সঙ্গে একটা স্থটকেস থাকলে যথেষ্ট ওর সঙ্গে লটবহর থাকবে অজন্্র আমার চাকরের দরকার নেই। ওরঝি চাঁকর না থাকলে চলে না ভাবতেই পারা ষায় না যে ওর সামনে আমি রাস্তা খু'ঁড়ছি, ৮৫৮-এ দাড়িয়ে বীয়ার খাচ্ছি না, না, যদি যেতে চায় তা হলে আমি যেতে চাইনে ।”

চন্দ্রকিরণ ওর স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে যাবে না। ওর স্ত্রীও ওকে একলা যেতে দেবে না। সমস্যার সমাধান আমার জান ছিল না। আমি চুপ করলুম।

"স্ত্রীর বোঝা বহন করার চেয়ে গন্ধমাদন বহন কর। সহজ কলকাতা থেকে দাজিলিং যেতেই হিমসিম খাই বিলেত যেতে হলে মার! যাব 1” চন্দ্রকিরণ আবার দীর্ঘনিঃশ্বীস ফেলল

তার পর সে লক্ষ্য করল যে আমি মৌন রয়েছি বলল, “এখন বুঝতে পারলে তো কেন তোমাকে খুঁজছিলুম এবার পথ নির্দেশ করো ।”

পথ কোথায় যে পথ নির্দেশ করব। বললুম, “দাড়াও, ভাবি ।” কিন্ত

২৪ কামিনীকাঞ্চন

ভেবে কোনো কুল কিনারা পেলুম না। পুনার্শিনের দিন ফেললুম কিন্তু তার আগেই আমাকে কলকাতা ছাড়তে হলো

এই ঘটনার বছর কয়েক পরে আবার তার সঙ্গে দেখা মহাযুদ্ধের মাঝখানে তার আমার দু'জনেরই কেশে পাক ধরেছে তারই বেশী। সাহিত্যের আসরে নয়, লঙ্গরখানায়। চন্দ্রকিরণ পুণ্যসঞ্চয় করছিল মন্বস্তরের সময় হতভাগ্যদের তরলান্ন খাইয়ে পিইয়ে বললে আরো ঠিক হতো। আমি কলকাতা এসেছি শুনে লোক পাঠিয়ে দিয়ে ধরে নিয়ে গেল এক লাইন স্থপারিশ সংগ্রহ করতে | যাতে যথেষ্ট চাল পাওয়া যায়।

“থুব ফাকি দিলে সেবার |” চন্দ্রকিরণ বলল।

“যাক, খবর কী তোমার? সব ভালো তো?” আমি জিজ্ঞাসা করলুম।

“বেঁচে আছি তা তো দেখতেই পাচ্ছ। কিন্তু বেঁচে থাকা-_নয় সে তো বীচা।” সে পূর্বের মতো আক্ষেপ জানাল

কঙ্কাললার নরনারীর সঙ্গে তার ঘ্বৃতপুষ্ট বপুথানির তুলনা করে মনে হলো! না যে সে জীবন্মত। বরং এই কয় বছরে আরো মেদ বৃদ্ধি হয়েছে

“কেন, বাচার কমতি কোথায়?” আমি প্রশ্ন করলুম

«সেই একঘেয়ে জীবনযাত্রা |” সে ঠোঁট উলটিয়ে বলল। তেমনি বিরস উদাস শ্বরে। “আর ভালো লাগে না তার জের টানতে এবার বেরিয়ে পড়তে চাই এক বস্ত্রে একখানা কম্বল সম্বল করে। সাধুদের সঙ্গে মিলে কেদার বদরী যাব। সেখান থেকে ঠকলাস মানস সরোবর 1৮

“বৌদি যেতে দেবেন তো?”

পথ গেছে হারিয়ে ২৫

“বৌদি যেতে দেবেন? ক্ষেপেছ ?”

“তা হলে কেমন করে সম্ভব ?”

“কেমন করে সম্ভব 1” চন্দ্রকিরণ প্রতিধ্বনি করল। “আমিও সেই কথা বলি।”

“এক কাঁজ করলে হয় না? বৌদিকেও নিয়ে গেলে দোষ কী ?”

“তা হলে গিয়ে কোনো স্থখ নেই তা হলে কি আমি ধুনী জালিয়ে করতে পারব!” চন্দ্রকিরণ তার মনের কথা খুলে বলল।

"তোমার হঠাৎ খেয়াল চাপল কেন?” আমি জানতে চাইলুম।

“খেয়াল নয়। জীবনের দ্বারে দ্বারে করাঘাত হানা ।” চন্দ্রকিরণ রহন্তযমগ্ন হয়ে বলল, “কে জানে কখন কোন দরজ! খুলে যাবে! প্রবেশপথ পেয়ে যাব।?

আমি বললুম, “ভালো কিন্তু বৌদিকেও সঙ্গে নিয়ে যেয়ো ।”

চন্দ্রকিরণ আমার ছুই হাত ধরে ঝাকানি দিয়ে বলল, “তুমি কি মনে করো আমি কথা ভাবিনি? ভেবে দেখেছি তা হবার নয়। যদি আমার সঙ্গে যায় ওকে গোপন করতে পারব না। কাজেই আত্মগোপন করতে পারব না। আর তাই যদি না পারলুম তবে আর দশজনের মতো তীর্থযাত্রা করলেই হয় জীবনের দ্বারে দ্বারে করাঘাত হান! দুরাশা, যদি আত্মগোপন করতে না পারি ।”

কথাটা বুঝতে আমার অনেকক্ষণ লাগল জিজ্ঞাসা করলুম, “আচ্ছা, আত্মগোপন করার জন্তে তোমার এত ব্যগ্রতা কেন? তুমি কি খুনটুন করেছ, না আর কোনে! শোচনীয় অপরাধ ?”

"অপরাধ!" চন্দ্রকিরণ কাতর কে বলল, “অপরাধ কি একটি না এক বার! এই যে এতগুলো মহাপ্রাণী খেতে না পেয়ে কলকাতার

২৬ কামিনীকাঞ্চন

ফুটপাথে ফুটপাথে পড়ে মারা যাচ্ছে এরা তো সাধারণ ভিখিরী নয়। এর! খেটে খাওয়া মানব এদের মুখের গ্রাস আমর! বেশী দাম দিয়ে কিনে এনেছি আমরা মানে আমার মেজ মামা তার কোম্পানি ঘরের উপর বিধাতার অভিশাপ পড়বে, সেই ভয়ে আমি লঙ্গরখা না খুলেছি। আমার মামাতো ভাই প্রছ্যন্ন তো দ্রিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে কেউ বলতে পারে না কী তার অন্থখ। নিজে বলতেচায়না। বোবার মতো বসে থাকে হাবাগোবার মতো দেখে কষ্ট হয়।”

লক্ষ করলুম চন্দ্রকিরণের চোখ ছলছল করছে। প্রশ্ন করলুম, “আর তোমার মামা ?”

“মামা দিনের বেলা অর্থ অর্জন করেন, রাঁতের বেলা ধর্ম অর্জন রোজ কাঁলীঘাটে যান। ফিরতে দশটা এগারোটা বাজে মামী বলেন, কার জন্যে এত টাকা করছ? ভোগ করবে কে? ছেলেটা তো চিকিংসার বাইরে 1”

আমি প্রসঙ্গ আর বাড়তে দিতে রাজি ছিলুম না। মোড় ঘুরিয়ে দিলুম। বললুম, “তা হলে তুমি আত্মগোপন করে সাধুদের সঙ্গে সাধু সাজতে চাও। বেশ, বেশ ।”

“ভেক নেব না। সংসার ত্যাগ করব না।” চন্দ্রকিরণ বুঝিয়ে বলল, “কিন্ত কিছু কালের জন্যে বাচব। এখন এরা আমাকে বাচতে দিলে হয় !”

এরা মানে জীবনসঙ্গিনী গৌরবে ব্হুবচন। জীবনসঙ্গিনী যিনি, তিনি তাকে বাচতে দিলে হয়! শুনে আমি হাসব না কাদব! রলিকতা করবার মতো! বিষয় বটে। কিন্তু স্থান কাল পাত্র রসিকতার অনুকূল নয়। তা বলে চোখের জল ফেলব কেন?

পথ গেছে হারিয়ে ২৭

বললুম, “আচ্ছা, বৌদির অনুমতি নিয়ে বেরিয়ে পড়ো। জগতটা যা ভেবেছ তা নয়। ছু*দিন বাদে আপনি ফিরে আসবে মানস সরোবর পর্ষস্ত যেতে হবে না।”

“মানস সরোবর দুরের কথা, মোগলসরাই পর্যস্ত গিয়ে ফিরতি ট্রেন ধরব, তার জে। নেই। হয় ওকে সঙ্গে নিতে হবে, নয় নিতে হবে এক পাল চাকরবাকর। একল! যাওয়া চলবে না। আর একলাই যদি না গেলুম তবে গিয়ে স্থখ কোথায় 1” চন্দ্রকিরণ তার প্রীণের ব্যথা জানাল

বেচারা! তার জন্যে কীই বা করতে পারি! সহাঙ্গৃভৃতিস্চক দু'চার কথা বলে বিদায় চাইলুম। সে বলল, “পথ নির্দেশ করলে নাষে?”

“ভেবে দেখি |” এই বলে পাশ কাটালুম।

চন্দ্রকিরণের সঙ্গে সেদিন দেখা হলে! পার্ক স্রীটের একটা বিলিতী বইয়ের দৌকানে এক রাশ ভ্রমণকাহিনী কিনেছে আরো কয়েক- খানার পাতা ওলটাচ্ছে। বয়স পয়তাল্লিশ কি ছেচল্লিশ, কিন্ত দেখলে মনে হয় পঞ্চানন কি ছাগ্নান্ন। মাথায় চুল যে ক'গাছি আছে কানের আড়ালে আত্মগোপন করেছে। ভুঁড়ি কিন্ত আত্ম- গোপনের আশ! ছেড়ে দিয়েছে চেহারা, চীলচলন পোশাক- পরিচ্ছদ থেকে মালুম হয় একজন সন্্াস্ত ভদ্রলোক বটে। একজন বধধিষুঃ নাগরিক

কুশলবিনিময়ের পর জিজ্ঞাসা করলুম, “এখনো! বাতিক গেল না!»

২৮ কামিনীকাঞ্চন

“বাতিক!” সে বিস্মিত হয়ে বলল, “বাতিক কাকে বলছ! যে আমার প্রাণ। যদি যেত প্রাণ থাকত ভাবছ 1”

জানতে চাইলুম ইতিমধ্যে কোথাও বেড়াতে গেছে কি না।

বলল, "হা, এইবার বেরিয়ে পড়ব। আর ভালো লাগে না এমন করে বেঁচে থাকতে খাবার স্থখ ছিল, তাও ঘুচে গেল কণ্ট্োলের জালায়। শুনছি মিউনিপিপাল রেট বাঁড়বে। বাঁড়ুক, আমি তত দিনে কালাপানি পার !”

“এবার কোন দেশে চললে ?”

“দেশ 1” সে সম্বস্ত হয়ে বলল, “না, না, দেশ দেখে স্থখ নেই সব দেশেই কণ্টোল। সব দেশেই ট্যাক্স্‌। এবার যাচ্ছি কার্গো বোটে, বন্দর থেকে বন্দরে কলকাতা থেকে আফ্রিকা ঘুরে একশো বছর আগে যেমন করে লণ্ডনে যেত তেমনি করে যাৰ লণ্ডনে, আমস্টারডামে, কোপেনহেগেনে, স্টকহলমে সম্ভব হলে লেনিনগ্রাডে। তার পরে পিছু হটতে হটতে হামবুর্গ ব্রিমেন হয়ে নিউ ইয়র্ক। তার পর দক্ষিণ আমেরিকা পরিক্রমা করে সান ফ্রান্সিক্কো। সেখান থেকে টোকিও শাংহাই হংকং। অবশেষে সিঙ্গীপুর রেহুন চট্টগ্রাম হয়ে কলকাতা |”

আমি তারিফ করে বললুম, “চমৎকার !”

সে খুশি হয়ে আমার হাতে হাত রেখে বলল, চমৎকার কি না তুমিই বলে! তুমি ছাড়া আর কেউ আমাকে চিনল না, কেউ আমাকে বুঝল না। যে শোনে সেই বলে, পাগল না ক্ষ্যাপা বাড়িতে তো অনশন ধর্মঘট | এবার বলছে না যে আমাকেও সঙ্গে নিয়ে চলো। এবার বলছে, তোমাকেও যেতে দেব না। কী অন্যায় গ্যাখ দেখি। আমি এখন বুঝতে পেরেছি কোনখানে ওর ছূর্বলতা। সেইজন্যে আমিও চাপ

পথ গেছে হারিয়ে ২৯

দিচ্ছি। বলছি, চলো, একসঙ্গে বেরিয়ে পড়া যাক। তুমি আর আমি এক নৌকায় ।”

আমি উপভোগ করছিলুম তাঁর অবস্থাট।। ব্ললুম, “সাবাশ 1”

চক্্রকিরণ আমার হাত ধরে আমাকে টেনে নিয়ে চলল ফ্লুরি'তে। 'কেক খেতে খাওয়াতে বলল, “কতকটা প্যারিসের পাতিসেরির মতো নয় কি?”

তাঁর মনে ছুঃখ হবে বলে ঘুরিয়ে বললুম, “নয় তো কী!”

তার বিশ্বাস সে কলকাতায় বসে প্যারিসের স্বাদ পাচ্ছে। কেবল প্যারিসের কেন? এই তো অকস্ফোর্ড বুকশপ থেকে বই কিনল। ভাগ্যিস আমাকে বলেনি, “কতকটা অকৃন্ফোর্ডের মতো নয় কি?”

কেক খেতে খেতে চন্দ্রকিরণ প্র।য়ই অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিল। মন তার তখন ফ্লোরেন্মে কি রোমে বলছিল, “গিয়েই বা কোন স্থখ! সবই তো ভেঙে-চুরে দিয়েছে আমেরিকানরা 1”

"না। সব ভেঙে-চুরে দেয়নি। অনেক কিছুই অক্ষত রয়েছে ।” আমি আপত্তি করলুম।

তাতে উল্টো ফল হলো চন্দ্রকিরণ বিমর্ষ হয়ে বলল, “কে জানে রাশিয়ানবা কোনদিন ভেঙে-চুরে দেবে! তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাধবে শুনছি তার আগে যদ্দি নাদেখি তো এজন্সে দেখা হলো না। প্রত্যেকটি দিন মুল্যবান | কিন্তু-_” শেষ করতে পারল না। মুখ বন্ধ ছিল কেকে।

“চলো একটু স্াগড ঘুরে আমি ।” প্রস্তাব করল চন্দ্রকিরণ। স্্রাণ্ড এক্ষেত্রে কলকাতার স্্বাড রোড নয়, লগ্ডনের স্্বা। আমি রাজি হলুম।

হাওড়া ব্রিজ থেকে শুরু করে আমরা গঙ্গার ধার ধরে মোটরে

৩০ কামিনীকাঞ্চন

ঘুরলুম। খিদিরপুর ডক পর্যস্ত। জাহাজের দিকেই আমাদের দুজনের দৃষ্টি। রকমারি দেশের রকমারি নিশান উড়ছে কোনটা কোন দেশের তাই নিম্নে চন্দ্রকিরণ উৎসাহের সঙ্গে পাগ্ডিত্য ফলাতে লাগল। গ্রীক লিপিতে, রুশ লিপিতে লেখা ছিল কয়েকটার নাম। চন্দ্রকিরণ অক্েশে উদ্ধার করল।

মনে মনে এই সব জাহাজে চড়ে সে সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে এসেছে মাসের মধ্যে ছু'একদিন সে জাহাজগ্ুলে৷ দেখে যায়। এগলে। যেন চাদ সওদাগরের সপ্ত ডিডা। বাঙালীর ছেলেরা একদিন এইসব নৌকায় করে জাভা বালি স্থ্মাত্রা সিংহল পাড়ি দিত। জাভা দ্বীপের মন্দিরের গায়ে এখনে! বাংলা লিপি উতৎবকীর্ণ রয়েছে চন্দ্রকিরণ তার ফোটো আনিয়েছে।

“এই তো! জীবন 1” জাহাজের দিকে সতৃষ্ণ দৃষ্টিপাত করে চন্দ্রকিরণ। যেন তার তৃষ্তার জন। আর আমার দিকে ফিরে বলে, “ছেলেবেলা থেকে দেখে আসছি। চোখে দেখাই সার। জীবনকে দূর থেকে দেখে গেলুম কাছে যেতে পেলুম না|”

খিদিরপুর থেকে ফেরবার পথে আমরা কিছুক্ষণ ভিকৃটোরিয়া মেমৌরিয়ালের আশে পাশে পায়চারি করলুম। ওটা কতকটা হাইড- পার্কের মতো নয় কি? চন্দ্রকিরণ বলে গেল তার ঘরের কাহিনী মা এখনো বেঁচে বয়স যতই বাড়ছে ততই ভয় হচ্ছে ছেলেকে বিদেশে পাঠালে আর দেখতে পাবেন না। মাকে তবু কোনো! মতে বুঝ দেওয়া যায়। স্ত্রী একেবারে অবুঝ কেন? আজকাল সব জিনিসই তো কলকাতায় পাওয়া যায়__ইস্তক স্কাইক্ষেপার (915-5019761) | বিধানচন্দ্রের কপায় আগার গ্রাউ গত হবে।

পথ গেছে হারিয়ে ৩১

তার পর চন্দ্রকিরণের দ্বিতীয় অভিলাষ তীর্থে তীর্ঘে ঘুরে বেড়ানো সাধারণ তীর্ঘযাত্রীর যতো! নয়। সাধুদের সঙ্গে সাধুর মতো। লোটা কম্বল শুধু সম্বল ভোজনং যত্র তত্র শয়নং হট্রমন্দিরে। বা বিটপীতলে। গৃহিণীর বিষম আপত্তি কোন দিন কলেরা কি টাইফয়েড হবে। কে /চকিৎসা করবে, কে শুশষা করবে? টেলিগ্রাম আসবে, সব শেষ না, না, ওসব অনাশ্থট্টি চলবে না। তার চেয়ে দু'টো দিন সবুর করো। আমি আগে চোখ বুজি আমাকে রওনা করে দিয়ে তুমি রওনা হবে।

বেচারা চন্দ্রকিরণ! বই কিনে গাদা করেছে মন্ুমেণ্টের মতো হিমালয়ের কোন কোন কন্দরে কে কে তপন্যা করছেন, তিব্বতে কোন কোন মহাত্সা যোগ করছেন, বারো হাজার ফুট উঁচুতে কোন কোন আস্তানার অবস্থান সব তার জানা আছে। কেবল একবার বেরিয়ে পড়তে পারলে হয়। তার জন্যে ক্যামেরা কেনা হয়েছে, যেমন তেমন ক্যামেরা নয় সিনেক্যামেরা। দরকার হলে সে অক্সিজেন য্যাপারেটাস কিনতেও প্রস্তত। কিন্ত তাকে যেতে দিচ্ছে কে!

সাধুদের সঙ্গে লুকিয়ে দেখা করে। তারা বলেন এখনো সময় হয়নি যখন হবে তখন হবে। কিন্তু তত দিন বল বয়স থাকলে তো? বুড়ো হাড় নিয়ে হিমালয়ের শীত সইতে পারবে কেন? তখন রক্ত হিম হয়ে যাবে। শরীরে প্রতিরোৌধশক্তি থাকবে না। পুণ্য হবে হয়তো। কিন্তু সে কি পুণ্যের জন্তে পথে বেরিয়ে পড়তে চায় ! সে চায় জীবনের স্বাদ

একঘেয়ে লাগছে তার দৈনন্দিন জীবন, তার দিনগত পাপক্ষয়। তার ছদ্মবেশী শোষণ। তার মানুষ মৃগয়া। নিজের শ্রেণীর উপর তার অশ্রন্ধ! ধরেছিল কেবল যে নিজের শ্রেণীর পুরুষদের উপর অশ্র্ধ তাই নয়। নিজের শ্রেণীর মহিলাদের উপরেও এরাও শোষক শ্রেণীর

৩২ কামিনীকাঞ্চন

এরা শোধিত নন। এরা বাঘিনী। এরা হরিণী নন। .ভিতরে ভিতরে তার মূল্যবোধ বদলে গেছল। মূল্যমান ব্দলে গেছল। অথচ সংগ্রাম করবার সামর্থ্য ছিল না। ইচ্ছাও ছিল না। সে দুর্বল প্রকৃতির লোক। বড় জোর পলায়ন করতে পারে। সম্মুধীন হতে পারে না। তার আত্মাগোপনের প্রবৃত্তি ছুনিবার হয়েছিল। কিন্তু যতই সে আত্মগোপনের চেষ্টা করে ততই তার গৃহিণী তাকে তুল বোঝেন। চোখে চোখে রাখেন

চন্দ্রকিরণ চমকে উঠে বলল, “ও লোকটা কে? কেন ঘোরাফেরা করছে ?”

“আমাদেরই মতো বেড়াতে এসেছে ।”

“আরে না, না। ওকে আমি আরো কয়েক জায়গায় দেখেছি ।” চন্দ্রকিরণ আমার কানে কানে বলল, “আমাকে নজরবন্দী করা হয়েছে |”

আমার বিশ্বাস হলো না। সম্মিতভাবে তাকালুম।

“ঘরে পাহারা বাইরে পাহারা।” তাড়াতাড়ি গাড়ীতে উঠে বলে চলল, “ঘরে কে পাহারা দেয় তা তো জানো বাইরে পাহার! দিচ্ছে প্রাইভেট ডিটেকটিভ।”

আমি হতবাক হলুম কি কখনো সম্ভব!

“জীবনে স্থুখ নেই, ভাই। আপিসে আদালতে যাব। সেখানেও টিকটিকি। বইয়ের দোকানে যাব, সেখানেও তাই গড়ের মাঠে হাওয়া খেতে বেরোব, সেখানেও সেই ব্যাপার জাহাজঘাটে বা রেলস্টেশনে আমাকে যেতে দিচ্ছে কে! দূর থেকে তার বাশি শুনি। কাছে যেতে পারিনে আমার দশা তোমার বৈষ্ণব কবিতার শ্রারাধার মতো 1”

পথ গেছে হারিয়ে ৩৩

বেচার! চন্দ্রকিরণ! তার চোখ দেখলে মায়া হয়। এত বড় মানুষটা, ছোট্ট একটা শিশুর মতো! অসহায়। শিশুর মতো! সরল। অথচ ঘুঘু সলিসিটর। টাকার পাহাড়।

সেদিন তাকে সীতারাম ঘোষ স্ত্রী অবধি পৌছে দিতে হলো। কোম্পানির আমলের বাড়ি। কলোনিয়াল আকিটেকচার। গেট থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসব, চন্দ্রকিরণ আমার পথ রোধ করে দ্াড়াল। বলল, “এবার তোমাকে আমি ছেড়ে দেব না। পথ নির্দেশ করো। তারপরে যাবে।”

পথ